মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায় | মানসিক স্বাস্থ্য কি?

মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায়: আজ আমরা মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক রোগ কিভাবে নিরাময় করা যায় সে বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। আমাদের মনে কিছু ভ্রান্ত ধারনা রয়েছে মনোবিজ্ঞান এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে। আশা করি আজকের পর থেকে আপনাদের এ ধারণাগুলোর পরিবর্তন আসবে।

স্বাস্থ্যকে আমরা দুইটি ভাগে ভাগ করতে পারি।

১. মানসিক স্বাস্থ্য

২. শারীরিক স্বাস্থ্য

আমাদের জ্বর, সর্দি, কাশি ইত্যাদি হয়ে থাকে। এগুলোকে আমরা শারীরিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। অপরদিকে ধরুন আপনি বারবার বিসিএস পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হচ্ছেন। কিন্তু আপনি হাল ছাড়ছেন না। আপনি এরপরেও বিসিএস পরীক্ষাযর জন্য আরো বেশি জোর দিয়ে পড়ালেখা করছেন। এই যে মন থেকে আপনি একটি শক্তি পাচ্ছেন একে বলা হচ্ছে মানসিক শক্তি। আপনার মানসিক শক্তি যত বেশি থাকবে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য তত ভালো থাকবে। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে একজন মানুষ জীবনের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। তাই মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে আমাদের সকলের গুরুত্ব দেয়া উচিত।

আজকে আমাদের লেকচারের মূল বিষয় হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায়

ইংরেজিতে একটি কথা রয়েছে, Prevention is better than cure. অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ রোগমুক্ত অপেক্ষা অধিকতর শ্রেয়। কারণ রোগ প্রতিরোধ করতে পারলে রোগভোগের কষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যেমন, ঘূর্ণিঝড় আসার আগেই যদি আমরা নিরাপদ স্থানে যাই, তাহলে ক্ষতির সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ কমে যায়। শারীরিক স্বাস্থ্য অক্ষুন্ন রাখার জন্য আমরা বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যবিধি পালন করে চলি। এছাড়া কিছু রোগের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমরা পূর্বেই প্রতিষেধক ব্যবস্থা যেমন টিকা নিয়ে থাকি। যেমন বসন্তের টিকা, কলেরা বা টাইফয়েড এর টিকা ইত্যাদি। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও রোগ প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহন করা যায়। মানসিক স্বাস্থ্যকে অক্ষুন্ন রাখা এসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এর মূল উদ্দেশ্য।

কেবল রোগ হলেই কি মানসিক স্বাস্থ্য এর দিকে খেয়াল রাখতে হবে?

মানসিক স্বাস্থ্য বলতে শুধু মানসিক রোগের অনুপস্থিতিতেই বোঝায় যায় না। মানসিক স্বাস্থ্যের কিছু সদর্থক দিকও আছে। যেমন ব্যক্তির সুপ্ত সামর্থ্য সমূহের বিকাশ ঘটাতে পারা, ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা প্রাপ্তি, মানব কল্যাণ সাধনের জন্য দক্ষতা অর্জন ইত্যাদি। দিকগুলো সুষ্ঠু মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ শুধুমাত্র রোগ হওয়ার পরেই মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি ভাবা উচিত নয়। আপনার প্রতিটি কাজেই মানসিক পূর্ণতা প্রয়োজন। আপনি যেন প্রতিটি কাজ ঠিকভাবে করতে পারেন, এ জন্য মানসিক স্বাস্থ্য প্রয়োজন।

মানসিক রোগ প্রতিরোধ
মানসিক রোগ প্রতিরোধ

মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ধারণাটি মূলত সাম্প্রতিককালে উদ্ভব হয়েছে। এর ফলে এ সংক্রান্ত তথ্য পর্যাপ্ত নয়। তবুও মনোবিজ্ঞানীগণ প্রতিনিয়ত গবেষণা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যাচ্ছেন। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলে যে তথ্য উদঘাটন হচ্ছে, তার উপর ভিত্তি করে বর্তমান মনোরোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

মানসিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে তিনটি ধাপে বিভক্ত করা যায়। এগুলো হচ্ছে

১. মুখ্য প্রতিরোধ

২. গৌণ প্রতিরোধ এবং

৩. তৃতীয় ধাপের প্রতিরোধ

মুখ্য প্রতিরোধ: রোগ যেন একেবারেই না হয়, এজন্য যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় তাকে মুখ্য প্রতিরোধ বলে।

গৌণ প্রতিরোধ:

যদি রোগ হয়ে যায় তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা এবং রোগীকে কোন চিকিৎসা কেন্দ্রে রেখে দ্রুত রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করাকে বলা হয় গৌণ প্রতিরোধ। এক্ষেত্রে সাইকোলজিস্ট এর পরামর্শ এবং চিকিৎসা নেয়া উচিত।

তৃতীয় ধাপের প্রতিরোধ(মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায়):

গৌণ প্রতিরোধ যদি ব্যর্থ হয়ে যায় অর্থাৎ রোগ যদি জটিল আকার ধারণ করে তবে রোগীকে হাসপাতালে প্রেরণ করা এবং দ্রুত রোগমুক্তি ঘটিয়ে রোগীকে পুনরায় তার পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা ও রোগ পরবর্তী পরিচর্চার ব্যবস্থাকে তৃতীয় ধাপের প্রতিরোধ বলা হয়।

এখন প্রতিটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে আমরা বিস্তারিত জানব। যেন মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা পরিপূর্ণ হয়।

মুখ্য প্রতিরোধ:

মুখ্য প্রতিরোধ আবার তিন রকমের। যেমন,

জৈবিক প্রতিরোধ, মনোসামাজিক প্রতিরোধ, সমাজ-কৃষ্টিমূলক প্রতিরোধ।

নিম্নে এগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।

জৈবিক প্রতিরোধ:

একটি সুস্থ ও সবল শিশুর জন্মের ওপর নির্ভর করে সেই শিশুর ভবিষ্যৎ শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য। একটি উপযুক্ত শিশু জন্মদানের জন্য পরিকল্পিত পরিবার গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ পরিবার পরিকল্পনা দিয়েই প্রথম প্রতিরোধ ব্যবস্থা শুরু হয়। একটি দম্পতি কখন সন্তান নিবে, কয়টি সন্তান নিবে, সন্তান নেওয়ার মাঝে কত সময়ের ব্যবধান থাকবে? এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সন্তান লাভের জন্য তাদের মানসিক প্রস্তুতি আছে কিনা? সন্তান পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা, অর্থ ও সময় তাদের আছে কিনা? একমাত্র পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব প্রশ্নের উত্তর সঠিকভাবে পাওয়া যায় এবং এই সংক্রান্ত সমস্যাবলি দূরীভূত করা যায়।

এক্ষেত্রে জেনেটিক কাউন্সেলিং (Genetic counseling) গুরুত্বপূর্ণ। আমরা জানি যে জিন সংক্রান্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি বহুবিধ শারীরিক ও মানসিক সমস্যা ঘটাতে পারে। সুতরাং দম্পতি তাদের জিন বিশ্লেষণ করাতে পারে এবং কোনো ত্রুটি থাকলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসারে পরবর্তী কার্যক্রম হাতে নিতে পারেন। মাতৃগর্ভে অবস্থিত ভ্রূণের ও জিন বিশ্লেষণ করা যায়। গর্ভবতী মাকে প্রতিনিয়ত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে রেখে পুষ্টি স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যা করা প্রয়োজন। শিশুর জন্মের পর অনুরূপভাবে শিশুর পরিচর্যা প্রয়োজন। মাতৃ ও শিশু মঙ্গল সনদগুলো ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জন্ম পূর্ববর্তী এবং জন্মপরবর্তী শিশুর অপুষ্টি ও দুর্বলতা, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বৈকল্য  ঘটাতে পারে। এই সমস্যাকে প্রতিরোধ করার জন্যই মা ও শিশুর পরিচর্যা প্রয়োজন।

মনোসামাজিক প্রতিরোধ:

জীবনের নানাবিধ সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য এবং সমাজে সুষ্ঠুভাবে সঙ্গতি রক্ষা করার জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে কিছু দক্ষতা অর্জন করতে হয়। জীবনধারণের জন্য তার যেমন শারীরিক নৈপুণ্য অর্জন প্রয়োজন তেমনি বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করার জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটানো এবং উপযোগী সামাজিক ভূমিকা ও দক্ষতা অর্জন করা প্রয়োজন। সুতরাং শিশুর মধ্যে যেন শারীরিক বুদ্ধিবৃত্তিক আবেগ এবং সামাজিক দক্ষতার বিকাশ পূর্ণমাত্রায় ঘটে সেদিকে খেয়াল রেখে প্রয়োজনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত শিশুর মধ্যে উপযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটাতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভ্রান্ত ধারণা এর জন্য বহু রকমের মানসিক সমস্যা ঘটে থাকে। এজন্য একটি শিশুর মধ্যে যেন বাস্তব পরিবেশ ও সমাজের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং জীবনের সাথে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটে, সেদিকে খেয়াল রেখে তার শিক্ষা ব্যবস্থা ও আনুষঙ্গিক পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে একজন ব্যক্তি যে সমস্যাসমূহের সম্মুখীন হয় সেগুলো সম্পর্কে পূর্বেই মানসিক প্রস্তুতি সৃষ্টি করা প্রয়োজন। যেমন বিবাহ ও বৈবাহিক জীবনের সমস্যা, পেশা গ্রহণ এবং পেশার সাথে সংগতি গর্ভসঞ্চার এবং সন্তান জন্মদান, মধ্যবয়স এবং শেষ বয়সের নতুন উপযোজন সমূহ ব্যক্তির জন্য অনেক চাপের সৃষ্টি করে। এ সম্পর্কে পূর্বেই মানসিক প্রস্তুতি থাকলে ব্যক্তি এই সমস্যাগুলো সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবে। অর্থাৎ ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য এর বিকাশ ঘটবে।

প্রতিটি মানব সমাজের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সেই সমাজের অন্তর্ভুক্ত প্রতিটি ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধান। এছাড়া প্রতিটি ব্যক্তির সামর্থ্য ও প্রতিভার বিকাশ এর জন্য সমান সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা। কিন্তু সত্য হলেও পরিতাপের বিষয় যে, সমাজের এই উদ্দেশ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তবে রূপ নেয় না। সমাজের লোকজন জাতি, ধর্ম ও মতাদর্শ ভেদে, গোষ্ঠীতে-গোষ্ঠীতে, দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে সৃষ্টি হয় সংখ্যালঘিষ্ঠ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ দল। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের উপর চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া প্রায় প্রতিটি সমাজে কিছু শাসক এবং শোষক গোষ্ঠী থাকে, যারা অন্যদের উপর শোষণ করে যায়।

সমাজের কোন বিধি-নিষেধ যদি সমাজের জনগোষ্ঠীর কোন অংশের উপর চাপের বা সমস্যা সৃষ্টি করে, তবে তা সংস্কারের মাধ্যমে নির্মাণ করাই সামাজিক ও কৃষ্টি মূলক প্রতিরোধ ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য।

অবশ্য এ ধরনের সামাজিক পরিবর্তন বেশ কঠিন। এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হয় দীর্ঘকালের চেষ্টা। যেমন, আমেরিকার নিগ্রোদের সমান অধিকার। তারা তাদের সমান অধিকার দীর্ঘকালের প্রচেষ্টার ফলে প্রতিষ্ঠা করেছে। এ ধরনের সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টির ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীরা অর্থাৎ মনোবিজ্ঞানীগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এছাড়া মনোবিজ্ঞানীগণ সংকটাপন্ন ব্যক্তিদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে পারে এবং তাদের প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ দিয়ে তাদের চাপ লাঘব করতে পারে।

আশা করি মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায় অনেকটাই বুঝে গেছেন। এতক্ষণ আমরা মুখ্য প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা করলাম। পরবর্তীতে আমরা গৌণ প্রতিরোধ এবং তৃতীয় ধাপের প্রতিরোধ নিয়ে আলোচনা করব। মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আমরা শুরু থেকেই সচেতন হলে বিভিন্ন মানসিক রোগ নিরাময় করা সহজ হয় এবং আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। আমরা যেন সঠিকভাবে ও সচেতনভাবে মানসিক স্বাস্থ্য এর দিকে নজর রাখি এ প্রত্যাশায় আজকের লেখা এ পর্যন্তই।

মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায় এর পরবর্তী পোস্ট করুন এখান থেকে: মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায়: মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানুন

আমাদের বাকি লেখাগুলো পেতে ক্লিক করুন এখানে

2 thoughts on “মানসিক রোগ থেকে মুক্তির উপায় | মানসিক স্বাস্থ্য কি?”

Leave a Comment